অসমাপ্ত মীম

by | Dec 10, 2025 | Golpo | 0 comments

সিয়াম কি পারবে এই পরিস্থিতিতে মীমকে বিয়ে করতে? অথবা তার কী করা উচিত? আসলে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলে যে কেউ সঠিক সিদ্ধান্ত খুঁজে নিতে ভেঙে পড়বে………
কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাই তো?? না-বোঝারই কথা। হুট করে কেউ কি আর পরামর্শ দিতে পারে?

প্রথম থেকেই শুরু করি, খুব সংক্ষেপে বলছি, দেখা যাক আপনি কোন প্রকার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন কিনা…..

__সিয়াম এবং মীমের রিলেশনশিপ আজ প্রায় ১ বছর। ১ বছর হোক আর ১০ বছর হোক, কিন্তু তাদের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করতে গেলে উপচে পড়বে।

মীম চট্টগ্রামের সুনামধন্য শিল্পপতি ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে। তার বাবার প্রচুর টাকা; প্রায় সময় ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে থাকেন তিনি। মীম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত।

অন্যদিকে নিউইয়র্কে অবস্থানরত সিয়াম মা–বাবার একমাত্র ছেলে সন্তান। একটি ছোট বোন রয়েছে তার। বছর তিনেক হলো তারা স্বপরিবারে দেশের বাইরে থাকছে। সিয়ামের বাবা চাকরি করেন; সিয়াম MBA করার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জব করে এবং ছোট বোন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।

__সিয়াম এবং মীমের পরিচয় ফেসবুকে। কিভাবে তারা ফ্রেন্ড হলো তা তাদের নিজেদেরই মনে নেই। তবে ভালোবাসার সূত্রপাত “হাহা” রিয়েক্ট থেকে। মীমের মন খারাপের পোস্টে সিয়ামের এই প্রতিক্রিয়া সহ্য করতে না পেরে সিয়ামকে সরাসরি মেসেঞ্জারে নক দেয় মীম। এরপর যা হওয়ার… তুমুল ঝগড়ার মাঝে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়।

মীম যেমন জেদি তেমনি আবেগপ্রবণ। সিয়ামের কমেন্টের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে রাগে–ক্ষোভে ফেসবুক থেকে বেরিয়ে পড়ে মীম।

যে মেয়ে ফেসবুক ছাড়া থাকতে পারে না, সে মেয়ে আজ ৭ দিন যাবৎ ফেসবুকে ইনএকটিভ।
বিষয়টি একদম মেনে নিতে পারছে না সিয়াম। নানা চিন্তা তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কোনোভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না মীমের সাথে। আর কীভাবেই বা হবে—ফেসবুক ছাড়া যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না সিয়ামের।

হঠাৎ এক রাতে মেসেঞ্জারে মীমের আইডির পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখে খুশিতে আকাশ থেকে যেন নেমে এসেছে সিয়াম। নক দেওয়ার আগেই মীমের মেসেজ এসে পৌঁছালো সিয়ামের ইনবক্সে।

  • stupid…..

  • কেন?

  • কেন আবার! সব প্রশ্নের উত্তর হয় না। huh…

  • তা বুঝলাম, কিন্তু তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?

  • জাহান্নামে ছিলাম… তোমার সমস্যা??

  • প্লিজ, আমি ঝগড়া করতে আসিনি। আমি অনেক ভয়ে আর দুশ্চিন্তায় ছিলাম তোমাকে অনলাইনে না দেখে। ভেবেছিলাম, কী না কী হয়েছে…

  • আমার কি হবে? যা হওয়ার অনেক আগেই হয়েছে।

  • মানে?

  • নাহ, কিছু না। তোমার খবর বল…

  • আমি অনেক ভালো আছি। তুমি ঠিক আছ?

  • আমিও ভালো আছি……

    __এভাবে অনেক কথা হয় ২ জনের মাঝে। রাত শেষে হাসি–ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে দুজন ঘুমিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে কেটে গেল প্রায় এক মাস। এরপর সোশ্যাল মাধ্যমে তাদের ভিডিও কলে কথা হত, চ্যাট হত, রাতে ঘুমানোর পূর্বে কথা বলা যেন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেল। অনেক সময় এত রোমান্টিক্যালি তারা কথা বলত যেন স্বামী–স্ত্রী, যদিও তখনো তারা রিলেশনশিপে আবদ্ধ হয়নি।
    নানা রাগ–অভিমান আর সাথে শেয়ার–কেয়ারের মধ্যে দিয়ে তাদের সময় বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছিল।
    এসব ভালোলাগার মাঝে কখন কিভাবে তারা সম্পর্কে জড়িয়ে গেল নিজেরাই বুঝতে পারল না।

    __আর কয়েক মাস পর সিয়াম এবং তার পরিবার মাত্র এক মাসের ছুটিতে দেশে ফিরছে। এই ছুটিতে সিয়ামকে বিয়ে করানোর ইচ্ছে আছে তার পরিবারের। অবশ্য দেশে ফিরবার পূর্বেই বেশ কয়েকটি মেয়ের খোঁজ নিয়ে রেখেছেন তারা। এদিকে সিয়াম এখনো মীমের ব্যাপারে কিছুই বলেনি তার মা–বাবাকে।
    অবশেষে নিউইয়র্ক থেকে প্রিয় মাতৃভূমি চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়েছে সিয়াম। মীমের জন্য অনেকগুলো উপহার আর ভালোবাসা নিয়ে শত জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সন্ধ্যায় দেশে ফিরেছে সিয়াম।

    __পরদিন সকালে প্রথমবারের মতো মীমকে চোখের সামনে দেখার জন্য একগাদা গিফট নিয়ে রেস্টুরেন্টে দেখা করে দু’জন। মীম আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। সিয়াম রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতেই অনেক দূর থেকে চিনতে পারে মীমকে। সাদা–কালো থ্রি-পিস আর হিজাবে ফুলবাগানের প্রজাপতির মতোই লাগছিল তাকে।
    আর অপেক্ষা করতে পারল না সিয়াম। অনেকগুলো ফুল আর গিফট নিয়ে এগিয়ে গিয়ে এই প্রথম মীমের সামনে দাঁড়িয়ে বলল—

  • I love you…

  • I hate you…

  • কেন?

  • ৩০ মিনিট দেরি করে এসেছ, আবার বলছ কেন!

  • sorry… sorry… আসলে তোমার জন্য ফুল খুঁজতে গিয়ে এমন হয়েছে।

  • হয়েছে, আর বাহানা করতে হবে না। I love you too… চল, কেক কাটি।

  • কেক কেন?

  • আজব! আজকে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছে। আমরা কি একটু আনন্দ করতে পারি না? একটি কেক কেটে সেলিব্রেট করতে পারি না?

  • হুম, তাই তো, ঠিকই বলেছ… চল চল।

    __ছেলে হিসেবে সিয়াম অনেক ভালো এবং স্মার্ট; এটি তার প্রথম ভালোবাসা। অন্যদিকে মীম যদিও একটু শুকনা, কিন্তু অনেক বেশি সুন্দর আর মায়াবী।
    রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সারাদিন অনেক ঘুরাঘুরি শেষে সন্ধ্যায় বিদায় পর্ব… কিন্তু খুব ভালো আর আনন্দমোহন দিনটিকে তারা বিদায় জানাতে একদম রাজি নয়। কিন্তু
    কিছুই করার নেই, মনে পড়ে গেল অতি পরিচিত প্রবাদ— “যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়; তবু চলে যায়।”

    __পরদিন সকালে সিয়াম তার মা–বাবার সাথে পছন্দের পাত্রী দেখতে যায় গ্রামে। শুধুমাত্র মা–বাবাকে খুশি করতে মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে পাত্রী দেখতে যাওয়া, কারণ ফলাফল সিয়াম আগেই ঠিক করে রেখেছে— “পাত্রী পছন্দ হয়নি।”
    এভাবে ২–৩ জন পাত্রী দেখা শেষ, কিন্তু সিয়ামের কাউকেই পছন্দ হলো না। মায়ের মুখে হতাশার ছাপ দেখে সিয়াম মীমের কথা বলেই দিল। সিয়ামের আগে থেকে পছন্দ আছে শুনে তারা খুব খুশি হলো এবং মেয়েকে দেখতে তাদের বাসায় যেতে সম্মতি জানালো।
    রাতে মহাখুশিতে মীমকে কল দিল সিয়াম।

  • মীম, আজ মাকে বলেই দিয়েছি তোমার ব্যাপারে। তাছাড়া আমার হাতে অল্প কিছুদিন সময় আছে। কাল তোমাকে দেখতে যাবে এবং তোমাদের ফ্যামিলির সাথে কথা পাকা করে আসবে।

  • না, কাল না প্লিজ। কাল আমরা একটু দেখা করি। তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।

  • যা বলার কাল তোমাদের ছাদে গিয়ে শুনব।

  • প্লিজ প্লিজ… কাল বাইরে একটু দেখা করি। খুব বেশি জরুরি কথাগুলো বলতে হবে তোমাকে।

  • ঠিক আছে। এখন ঘুমিয়ে পড়, আজ অনেক ক্লান্তিবিনোদন হলো।

  • হুম, শুভ রাত্রি।

  • শুভ রাত্রি।

    __পরদিন সকালে পার্কে দু’জন দেখা করে। প্রথম থেকেই আজ মীমের চোখে–মুখে হতাশার ছাপ। চঞ্চল মেয়েটি আজ খুব গম্ভীর হয়ে আছে, চুপচাপ সিয়ামের কথা শুনে যাচ্ছে। এবার সিয়াম হালকা ধমক দিয়ে—

  • কী হলো? চুপ হয়ে আছ কেন? বিয়ের কথা শুনে ভয় লাগছে?

  • না… আসলে তা না।

  • আচ্ছা, তুমি না কি বলবে বলে ডেকে এনেছ? এখন নিজেই চুপচাপ!

  • অবশ্যই বলব… কিন্তু কিভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার সাহস হচ্ছে না।

  • আরে বল না, কী বলবে? আমি আছি তো।

  • যদি শুনে তুমি চলে যাও?

  • না, যাব না। তুমি বল।

  • সত্যি বলব?

  • হুম, বল। খারাপ কিছু?

  • অনেক…………

  • কী এমন খারাপ? বল তো শুনি।

  • সিয়াম… আমার আগে একবার বিয়ে হয়েছে!!!

  • মানে!!

  • মানে আমি বিবাহিতা।

  • তুমি কী বলছ এসব? এতদিন বলনি কেন?

  • অনেকবার বলতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। আমাদের দিনগুলো এতই ভালো যাচ্ছিল যে কখনো ইচ্ছে হয়নি।

  • অহ আল্লাহ… কী শুনছি এসব! মীম তুমি ঠিক আছ??

  • আমি একদম ঠিক আছি এবং খুব ঠান্ডা মাথায় তোমাকে কথাগুলো বলছি। আমি চাইলে বিষয়টি লুকাতে পারতাম, কিন্তু আমি তোমার সাথে এত বড় প্রতারণা করতে পারব না।

  • যা করেছ তা কি প্রতারণা নয়??

  • আমি জানি না সিয়াম। তোমার যা খুশি তুমি করতে পারো, আমি মাথা পেতে নেব।

  • কী মাথা পেতে নেবে? কী করব আমি? আমি তোমাকে অনেক ভালোবেসেছিলাম মীম।

  • এখন কি ভালোবাস না?

  • কিভাবে ভালোবাসি বল… যেখানে তোমার স্বামী আছে, সেখানে আমার কিসের ভালোবাসা??

  • স্বামী… বিয়ে হয়েছে ঠিক, কিন্তু স্বামীর স্পর্শ, স্বামীর ভালোবাসা আমার কপালে জুটেনি।

  • মানে কী? খুলে বল…

  • বলছি… আমাদের বিয়ে হয় ২ বছর আগে। বাবার পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয় আমাদের। অনেক খুশি ছিলাম আমি; নানা রঙ্গিন স্বপ্ন নিয়ে নতুন জীবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছি। জীবন সাজানোর একগাদা স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘরে উঠলাম মাত্র, কিন্তু তখনো বাসর হয়নি আমাদের। দ্বিতীয় তলায় আমি রুমে বসে আছি একা। একে একে আমাকে বিদায় জানিয়ে সব আত্মীয়–স্বজন চলে যেতে লাগল, আর ধীরে ধীরে বাড়ির পরিবেশ শান্ত হয়ে এল।
    অনেকক্ষণ রুমে একা বসে থাকতে থাকতে খুব বোরিং হচ্ছিল, তাই হাঁটতে হাঁটতে একটু বেলকনির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তাছাড়া হাসবেন্ডকে সারপ্রাইজ দেওয়ার একটি প্ল্যানিং ছিল আমার। কিন্তু রুমের দরজার সামনে যেতেই চোখ পড়ল সিঁড়ির দিকে।
    যা দেখলাম তা দেখার জন্য আমি কখনো প্রস্তুত ছিলাম না।

  • কী দেখলে??

  • দেখলাম, আমার স্বামী সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এক মেয়েকে বুকে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে।
    এই দৃশ্য দেখে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমার হাত–পা কাঁপতে শুরু করল আর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। এরপর কখন অজ্ঞান হয়ে পড়লাম, আমার নিজেরই জানা ছিল না।

  • তারপর কী হলো??

  • এরপর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি আর মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই; সাথে আমার বাবাকেও দেখলাম।
    সামনে চোখ পড়তেই দেখলাম সেই নরপশু দাঁড়িয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু আমি ঝাঁকুনি দিয়ে হাত সরিয়ে দিলাম।
    সবাই আমার এই ব্যবহার দেখে খুব বিব্রত হলো।

  • then??

  • এরপর আমি বাবাকে ছাড়া সবাইকে বাইরে যেতে বললাম। তারপর বাবাকে সব ঘটনা খুলে বললাম।
    বাবা অনেক রাগ–ক্ষোভে চিল্লাচিল্লি আর সবাইকে অপমান করে আমাকে নিয়ে বাসায় চলে এলেন। সেখান থেকে ফিরে আসলাম, আর যাওয়া হয়নি—আর যোগাযোগ হয়নি আমার অপছন্দের সেই দ্বিতীয় ঠিকানার সাথে।

    পরে জানতে পারলাম মেয়েটি তাদের কাজিন হয়। অনেক আগে থেকেই তাদের এ বাজে সম্পর্ক ছিল; ২ জনের চরিত্রই ছিল খুব খারাপ। তারা বিষয়গুলো গোপন রেখে ছেলেকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল।
    এরপর বিয়ে নামক অধ্যায় থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। বাবা আমাকে অনেকবার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি আর কখনো বিয়ে করতে রাজি হইনি। অনেকবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি।
    অবশেষে তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর আমি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

    __এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে মীম। চোখের জল নাক বেয়ে টপটপ করে পড়ে অনেকটা ভিজিয়ে দিয়েছে জামাটা। কিভাবে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারছিল না সিয়াম। নিজেও অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে ছেলেটি, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে শক্ত থাকতে নিজেকে অনেক কন্ট্রোলে রেখেছে সে।
    এদিকে কান্নার জন্য আর কথা বলতে পারছে না মীম। সিয়াম পকেট থেকে টিস্যু বের করে মীমের চোখের জল আর নাকের পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। মীম কান্নার মাঝে এবার একটু মুচকি হেসে বলল— “হয়েছে… সোহাগ বাড়ছে তার! তোমাকে আমার নাক মুছিয়ে দিতে হবে না খেচ্চর। আমাকে দাও টিস্যু, আমি মুছতে পারি।”

    __অনেক কষ্টে মীমের কান্না থামালো সিয়াম, কিন্তু তারপরেও মাঝে মাঝে হেঁচকি দিচ্ছে মীম।
    দুপুর প্রায় ২টা। লাঞ্চ করার জন্য অনেক রিকুয়েস্ট করেছিল সিয়াম, কিন্তু মীম আজ কিছুই খেতে রাজি হয়নি। তাড়াহুড়ো করে একটি অটো ডেকে বাসায় ফিরে গেল মীম।
    রাতে ঘুমানোর আগে মীমকে কল দেয় সিয়াম…

  • হাই মীম, কেমন আছ?

  • ভালো আছি। তুমি?

  • ভালো। মন খারাপ?

  • না। মন খারাপ হবে কেন? মন তোমার খারাপ থাকার কথা।

  • আমি একদম ঠিক আছি।

  • এসব সত্য শোনার পরে তুমি ঠিক আছ নাকি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ?

  • মীম, তুমি যা ভাবছ তা কিছুই নয়। আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

  • তুমি কি আমাকে করুণা করছ? তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো না। আমার দিন খুবই ভালো কেটে যাবে।

  • প্লিজ মীম, অনেক হয়েছে আর না। আমি তোমাকে দয়া–করুণা কিছুই করছি না; বরং তোমার মুখে এসব শুনে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল।

  • I love you, Siam.

  • Love you too, Meem. আমি কাল সকালে মায়ের সাথে তোমার ব্যাপারে কথা বলব।

  • যদি তোমার মা আমাকে মেনে না নেয়??

  • এখন অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাও… কাল কথা হবে… bye, good night.

  • good night.
    পরদিন সিয়াম সকালের নাস্তার সময় খেতে খেতে মাকে সব বিষয় খুলে বলল—

  • মা, আমি সবকিছু মেনে নিয়ে ওকে বিয়ে করতে রাজি আছি।

  • কখনো না। বিবাহিতা মেয়েকে আমি আমার ছেলের বউ করে আনতে পারব না।

  • কেন মা? মীমের বিয়ে হয়েছে সত্য, কিন্তু স্বামীর প্রতি তার অধিকার, সংসার—এসব কিছুই তার কপালে জোটেনি।

  • আমি এসব কিছুই শুনতে চাই না। তুই আমার একমাত্র ছেলে; তুকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা–ভরসা আছে, অনেক স্বপ্ন আছে। আমি কিছুতেই ওই মেয়েকে আমাদের ঘরে তুলতে পারব না।

  • মা… মীম অতি সাধারণ একজন মেয়ে। মীমের কি একটি সুন্দর সংসার করার স্বপ্ন নেই? তুমি একবার কথা বলে দেখতেই পার।

  • না। ওই মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য অনেক ছেলে আছে। তোর কেন এত দরদ বাড়ছে? এই মেয়েকে ঘরে আনলে আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারব না।

  • মা, তোমার মনে কি একটু দয়া–মায়া নেই? তুমি নিজেই একজন মেয়ে। নিজের অবস্থান থেকে অন্তত চিন্তা করে দেখ…

  • সিয়াম, বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। তুই আমাকে শেখাতে আসবি না।

  • তুমি কি চাও মা, আমি তোমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলি? আমি চাইলে সেটা করতে পারতাম।

  • আমার মাথা খারাপ করিস না সিয়াম। তোর কি ওই মেয়েকে দরকার নাকি আমাদের?

  • মা… তুমি কী বলছ এসব???

  • ঠিকই বলছি। আমি যদি শুনি তুই ওই মেয়েকে বিয়ে করেছিস, তাহলে তুই আমার মরা মুখ দেখবি—মরা মুখ…

  • মা………………

  • কথাটা মনে থাকে যেন।
    __সিয়াম ভেবেছিল, মাকে বুঝিয়ে–শুনিয়ে রাজি করা যাবে, কিন্তু এতটাই বিপদের সম্মুখীন হতে হবে তা সিয়াম কখনো ভাবেনি। প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে সময় পার হচ্ছে সিয়ামের। সকালের নাস্তা খেয়েছে হালকা; এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মায়ের ছুঁড়ে দেওয়া শর্তের তীব্রতা এতটাই বেশি—ভাবলে শিহরিত হয়ে উঠছে বারবার। জীবনের প্রথম ভালোলাগা–ভালোবাসার নাম মীম; অন্যদিকে জন্মদাতা মাতা–পিতা।
    আজ সারাদিন একটি কল আসেনি মীমের। মেয়েটি হয়তো বুঝতে পেরেছে—বিষয়টি সিয়ামের ফ্যামিলি মেনে নেবে না।
    সন্ধ্যার পর মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিল মীমকে…

  • হ্যালো…

  • হুম সিয়াম, কেমন আছ?

  • ভালো মীম। তুমি?

  • খুব ভালো আছি। আজ সারাদিন একটি কল দাওনি। তোমার ফ্যামিলি রাজি হয়নি—এটি বলতে এত ভাবার কী আছে?

  • মীম, সত্যি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমি অনেক বুঝিয়েছি মাকে, কিন্তু…

  • আমি জানি সিয়াম। তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো; আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি—কিন্তু তারপরেও আমরা হেরে গেছি, তাই না?

  • মা প্রথমে রাজি ছিল, কিন্তু পরে তোমার বিয়ে হয়েছে শুনে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

  • আচ্ছা সিয়াম, প্রকৃতির নিয়ম এমন কেন?

  • কেমন?

  • এই যে—একটি ছেলের বেলায় এ ধরনের ঘটনা কোনো ব্যাপার না, কিন্তু একটি মেয়ের ক্ষেত্রে সারা জীবনের কান্না।

  • মীম, আমার ফ্যামিলি আমাকে খুব ভালোবাসে। তারা চায় আমি একজন অবিবাহিতা মেয়েকে বিয়ে করি।

  • সেটাই তো… সিয়াম, একটি বিষয় কি জানো?

  • কী??

  • ধর, একজন নারী ২–৪টি প্রেম করার পর অন্য পুরুষের সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসলে তাকে সমাজ খুব ভালোভাবে মেনে নেয়। হতে পারে, বিয়ের আগে সে প্রেমিকের সাথে অনেকবার শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে—কিন্তু এতে সমাজের কোনো মাথাব্যথা নেই। আর অন্যদিকে বিবাহিতা মেয়ের বেলায় হাজারো প্রশ্ন।

  • মীম, তোমার এই প্রশ্নের উত্তর আমি কখনো দিতে পারব না।

  • আমি তোমাকে উত্তর দিতে বলছি না। তোমার ফ্যামিলি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তোমার ভালোর জন্য। তুমি সবসময় সুখে থেকো, ভালো থেকো। আমি যেভাবেই আছি সারাজীবন কাটিয়ে নিতে পারব।

  • এভাবে বলছ কেন মীম?

  • যা বলছি তোমার ভালোর জন্য বলছি। তুমি বরং আমাকে ব্লক দিয়ে আমাকে ভুলে যাও। সুখ আমার জন্য আসেনি সিয়াম। আমার কপালে দুঃখ ছাড়া আসলে কিছুই নেই।

  • মীম, আর কয়দিন পর আমরা চলে যাচ্ছি দেশের বাইরে। প্লিজ, পরবর্তী দেশে আসা পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করবে কি? আমি যেভাবেই পারি সবকিছু ম্যানেজ করব।

  • আবেগ দিয়ে চিন্তা করোনা সিয়াম। তুমি কেন শুধু–শুধু আমাকে টেনে তোমার সুন্দর ফ্যামিলিতে ফাটল ধরাবে? আমার খুব কান্না পাচ্ছে… আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছি সিয়াম। তুমি ভালো থেকো।

    __এরপর রিপ্লাই দিতে গিয়ে সিয়ামের টেক্সট আর সেন্ড হয় না। অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করে রেখেছে মীম।
    মোবাইলে অনেকবার কল দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে—কোনোভাবেই ফোন রিসিভ করছে না মীম।
    এভাবে বেশ কয়েকদিন অনেকভাবে চেষ্টা করেছে, কিন্তু যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

    অবশেষে ছুটি শেষে দেশ ত্যাগ করার সময় এসে গেল। সবকিছু গুছিয়ে আবারো নিউইয়র্কের দিকে পাড়ি দিল স্বপরিবার।
    কিছুতেই ভুলতে পারছে না মীমকে। বারবার তার লাজুক চেহারা ভেসে আসছে সামনে।
    কিভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়?

    কিভাবে মা–বাবাকে সাথে রেখে মীমের সাথে সংসার করে তাকে একটি নতুন জীবন উপহার দেওয়া যায়??
    কোনোভাবেই উত্তরের খোঁজ মিলছে না সিয়ামের……

Written by Farhad Asif

Related Posts

যুক্তি

যুক্তি

তুর্য কমিউনিস্ট মা বাবার একমাত্র সন্তান। তুর্যের বাবা মুসলিম থেকে নাস্তিকে কনভার্ট হয় ২২ বছর বয়সে। তারপর সমাজের চাপে নিজ স্থান ছেড়ে চলে যায় অনেক দূরে। সেখানে ২৭ বছর বয়সে বিয়ে করে তার নাস্তিক এক বান্ধবীকে। ২ জনের সংসারে খুব আদর যত্ন আর ভালোবাসায় বেড়ে উঠে তুর্য। তুর্যের...

read more
মুখোশ

মুখোশ

আর মাত্র ২ ঘণ্টা বাকি। গতকাল হঠাৎ রেডিওতে এক সংবাদে গ্রামের সবাই শুনতে পেয়েছিল, আজ শুক্রবার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা একটি প্রকাণ্ড গ্রহের সাথে পৃথিবীর ধাক্কা হবে। এতে পৃথিবী ক্ষণিকের মাঝেই ধ্বংস হয়ে যাবে।এখন সকাল ৫:৩০ মিনিট... ফজরের নামাজ পড়ে বের হয়ে কেউ কেউ ছুটোছুটি...

read more
ভালোলাগা

ভালোলাগা

সেদিন ছিল শনিবার সকালবেলা। আমি ঘুমের নেশায় বার বার কাঁথা মাথা পর্যন্ত টেনে নিচ্ছিলাম ঠান্ডায়। হঠাৎ প্রচণ্ড এক বজ্রপাতের আওয়াজে ঘুম ভাঙে আমার। তড়িঘড়ি করে মুখ থেকে কাঁথা সরিয়ে বসে পড়লাম আর চোখ রাখলাম জানালায়। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, থমথমে ঠান্ডা পরিবেশ সাথে...

read more

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *