ভালোলাগা

by | Dec 9, 2025 | Golpo | 0 comments

সেদিন ছিল শনিবার সকালবেলা। আমি ঘুমের নেশায় বার বার কাঁথা মাথা পর্যন্ত টেনে নিচ্ছিলাম ঠান্ডায়। হঠাৎ প্রচণ্ড এক বজ্রপাতের আওয়াজে ঘুম ভাঙে আমার। তড়িঘড়ি করে মুখ থেকে কাঁথা সরিয়ে বসে পড়লাম আর চোখ রাখলাম জানালায়। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, থমথমে ঠান্ডা পরিবেশ সাথে মাথার ঠিক উপরে ফুল স্পিডে চলছে ফ্যান। প্রতিদিনের মত বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে চার্জার ক্যাবলটি খুলে ডান পাশের সুইচে চাপ দিলাম, সময় ১১ঃ৩৮। প্রতিদিনের তুলনায় আজ একটু বেশি ঘুমালাম কিন্তু আলসেমি এখনো কাটেনি, ইচ্ছে করছে আরো কিছুক্ষণ ঘুমাই। তবে আম্মুর বকা দিয়ে দিনটি শুরু করার কোন ইচ্ছে নেই আমার। আজ শনিবার ছিল বলেই আমাকে একটু সুযোগ দিয়েছে।

ভাবছেন শনিবার কেনো? আমি ছোট-খাট একটি জব করি কাস্টমার কেয়ারে যেখানে আমার ছুটি প্রতি সপ্তাহে শনিবার। মাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলাম তাই এখনো ভালো জবের জন্য চেষ্টা করা হয়নি। যাই হোক কাঁথা সরিয়ে উঠে ফ্যানের সুইচ অফ করে হাঁটতে হাঁটতে বেসিনের সামনে গিয়ে ব্রাশ হাতে নিলাম। ছোট বেলার অভ্যাস বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করা তাই নিজের অজান্তেই ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে বেলকনির দিকে চলে গেলাম।

যেই আমি ব্রাশ মুখে দিব চোখ পড়ল সামনের বেলকনিতে। ১৯/২০ বছরের একটি মেয়ে বেলকনির অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে জানালার শিক ধরে। গায়ে নীল রঙের ৩ কোয়ার্টার হাতের একটি থ্রি-পিস আর মাথার অর্ধেক পর্যন্ত ওড়না দেওয়া। ওড়নার নিচ দিয়ে হালকা ভেজা চুল দেখা যাচ্ছে, মনে হয় একটু আগে গোসল করে এসেছে। মেয়েটি সম্ভবত দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ছাতা হাতে মানুষের চলাচল দেখছিল। আমি তার ফেস দেখার জন্য মোটামুটি চেষ্টা করছিলাম, শব্দ করে করে ব্রাশ করছিলাম, কাশি দিচ্ছিলাম ইত্যাদি কিন্তু মেয়েটি আমার এসবে কোন পাত্তাই দিচ্ছিল না। শুধু মুখের একপাশ দেখতে পাচ্ছিলাম। নাকের ভাজটি দেখে মনে হচ্ছিল চেহারা অনেক মায়াবী হবে। তবে তার বাম হাত খুব ভালভাবেই দেখতে পাচ্ছিলাম। সুন্দর হাতের আঙুলে ছোট ছোট নখ রাখার ভালই অভ্যাস আছে বটে। ৪র্থ আঙুলে ছোট একটি রিং দেখতে পাচ্ছিলাম সাথে হাতে নীল রঙের ২টি চুড়ি।

ক্ষণিক পরে মেয়েটি তার বাম হাত নিচে নামিয়ে ঝাঁকাতে লাগলো অর্থাৎ হাত এদিক সেদিক ঘুরাতে লাগল, চুড়িগুলো সুন্দরভাবে হাতের কব্জি পর্যন্ত নেমে এল। আরো দেখলাম তার হাতের উল্টো পিঠে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত মেহেদির কারুকাজ। সব মিলিয়ে আমার কাছে এতই যে সুন্দর দেখাচ্ছিল আর মনে মনে ভাবতে লাগলাম কতই না সুন্দর মেয়েটির মুখখানি। আমি ৩ তলা ভবনে থাকি, আমাদের ২ জনের বেলকনির দূরত্ব ৬-৭ ফিট হবে তাই সবকিছুই খুব ভালভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম।

সময় আর পেলাম কই, ইতিমধ্যে আম্মুর ডাক– আম্মুঃ কিরে! কইরে তুই? আজ কি চা খাবি না নাকি? ব্রাশ করতে কি ১ ঘণ্টা লাগে নাকি?

আমিঃ এইতো আসছি আম্মু। তুমি চা দাও টেবিলে, আমিতো সেই কবে থেকে রুমে বসে আছি।

_আমি তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসে ২ মিনিটে চা-নাস্তা খেয়ে নিলাম। আজ চা-নাস্তা নিয়ে কোন কমপ্লেইন ছিল না কারণ আমার মন ছিল বেলকনিতে। আবারো ছুটে আসলাম বেলকনিতে কিন্তু ওখানে কেউ ছিলনা। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, কিছুই ভাল লাগছিল না। ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করার পর রুমে চলে আসলাম।

মোবাইল হাতে নিয়ে ডাটা অন করলাম, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম “মন খারাপ”। ভাবতে লাগলাম মেয়েটিকে যে বাসায় দেখলাম ওদের বাসায়তো এই বয়সের মেয়ে নেই। ওদের বাসার আন্টির সাথে আম্মুর খুব ভাব। আমাদের সবার সাথেও পরিচয় আছে তবে ওরা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রী থাকে আর তাদের ছোট দুটি সন্তান। বড় ছেলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে আর ছোট মেয়ে এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। আমরা ২ পরিবারই এই এলাকায় অনেক বছর যাবৎ তবে এই মেয়েকে আগে কখনো দেখিনি। কে হতে পারে? কে হতে পারে এসব ভাবতে ভাবতে মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছিল। টিউশনি করাতে আসেনি তো? নাহ ওটা হবে কেন? এখনতো স্কুল টাইম, ওটাও হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে দুপুর হয়ে গেল। গোসল সেরে লাঞ্চ করলাম। রুমে বসে আছি একা, ভাল লাগছিল না। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে লাগলাম। কিছুক্ষণ শুনার পর বিরক্তে হেডফোন খুলে নিলাম। মোবাইল গেমসে মনোযোগ দিলাম ঘড়িতে তখন বিকাল ০৩ঃ০৫। গেমস খেলতে খেলতে ০৪ঃ৩০, আম্মুর ডাক পড়ল…..

আম্মুঃ ফারহান ঘরে আছিস? থাকলে একটু এইদিকে আয় তো।

আমিঃ কি!!! কেনো ডাকছো আবার? পরে আসব।

আম্মুঃ পরে আসলে কিভাবে হবে? আজ আমার অনেক কাজ। তোকে একটা ছোট কাজ করে দিতে হবে, না করিস না প্লিজ।

আমিঃ উফ!! কি কাজ বল। আমি এখন বাজারে যেতে পারব না, আগে থেকে বলে দিলাম।

আম্মুঃ না, বাজারে যেতে হবে না। আমি কিছু নাস্তা বানিয়েছি, একটু কষ্ট করে পাশের বিল্ডিং এর তূর্য আন্টির বাসায় দিয়ে আসবি? জানি তুই ওখানে যেতে চাস না কিন্তু কি করব, আমার অনেক কাজ পরে আছে, না হয় আমি নিজেই দিয়ে আসতাম।

_এ বাক্য শুনে আমি মনে মনে এতই খুশি হলাম যেন ঈদের চাঁদ উঠেছে। ইচ্ছে করছিল নাস্তা নিয়ে বেলকনি দিয়ে এখুনি উড়াল দেই। আমিঃ এখন যেতে পারছ না কি হয়েছে? আগামীকাল দিয়ে আসবে (ইচ্ছে করেই বললাম)।

আম্মুঃ তোকে দিয়ে কোন কাজ করাতে পারিনা (অনেকটা রেগে)। কাল কি আর নাস্তা ঠিক থাকবে? তুই দিয়ে আসলে কি হয়? যা একটু কষ্ট করে দিয়ে আয়।

আমিঃ ঠিক আছে দাও তাড়াতাড়ি। তোমাদের স্বভাব আর গেল না। এসব নাস্তা আদান-প্রদান প্রথা যখন তোমরাই চালু করেছ, আমাদের যে কেন এসবের মাঝে জড়াও বুঝলাম না।

আম্মুঃ যা বাবা যা, প্রথার কি দেখলি? এসব সামাজিকতা, এভাবে একজনের খবর অন্যজন না নিলে বিপদে আপদে এগিয়ে আসবে কে?

_এই বলে আম্মু আমার হাতে নাস্তা ভর্তি টিফিন বক্স ধরিয়ে দিল আর বলল আসার সময় বক্সটি নিয়ে আসতে, যা আম্মু বরাবরই বলে কিন্তু আমি জানি টিফিন বক্স উল্টা নাস্তা ভর্তি পরে আসবে, আমাকে খালি বক্স দিবে না।

আম্মু রান্নাঘরে চলে গেল আমি কুসুম গরম বক্স হাতে আমার রুমে আসলাম। টি-শার্ট খুলে নীল কালারের একটি শার্ট গায়ে দিলাম। নীল আমার পছন্দের কালার কিন্তু প্রিয় কালার বলে না মেয়েটির জামার রঙের সাথে ম্যাচিং করে পরলাম। ৩ কোয়ার্টার প্যান্ট চেঞ্জ করে পাতলা জিন্স পরলাম সেই সাথে চুলে হালকা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম কেননা আমি জেল/তেল ব্যবহার করি না। মাথার সামনের দিকটা হালকা স্পাইক করে হাতে ঘড়ি পরলাম। এরপর মোবাইল পকেটে রেখে নাস্তার বক্স হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। আমিঃ ফাহিমা দরজা বন্ধ কর,আমি বাইরে যাচ্ছি।(ফাহিমা আমার ছোট বোন)

_টিফিন হাতে আমি বেরিয়ে পরলাম, সিঁড়ি বেয়ে নেমে ছোট একটি গলি পার হতেই আন্টির বাসা। অনেকবার আসলাম আন্টির বাসায় কিন্তু আজ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে প্রতিটা কদম অজান্তেই গুনতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে আমি ৩য় তলায় পৌঁছে গিয়েছি। আন্টির স্বামী ইসলামী ব্যাংকে জব করে, উনাদের দরজায় ইসলামী ব্যাংকের বড় একটি স্টিকার রয়েছে, এটি দেখেই থেমে গেলাম দরজার সামনে। অতি পরিচিত একটি স্টিকার। কেন জানি কলিংবেল দিতে সাহস পাচ্ছিলাম না। মনের মাঝে কি ভয় কাজ করছে নাকি অন্যকিছু তাও বুঝতে পারছিলাম না। প্রায় এক মিনিট পর আঙুল সুইচে রেখে দীর্ঘ একটি শ্বাস ছেড়ে চাপ দিলাম। ভেতরে বেলের শব্দ হচ্ছে আমি বাহির থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। কে যেন আসছে দরজার দিকে আমি বুঝতে পারছিলাম। ওই মেয়েটি আসছে নাকি দরজা খুলে দিতে? আজ সকালে বেলকনিতে মেয়েটিকে কত আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু এখন কেন এমন হচ্ছে বুঝলাম না।

(দরজা খোলার শব্দ পেলাম) আন্টিঃ ফারহান কেমন আছ? আস ভেতরে আস।

আমিঃ সালাম আন্টি। ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন? এই বক্সটি রাখুন । আম্মু আপনাদের জন্য নাস্তা দিয়েছেন।

আন্টিঃ আরে তুমি ভেতরে এসো না। আমরা ভালো আছি। ভেতরে বস, তোমার আংকেলও আছেন। ভাবি কেন শুধু শুধু কষ্ট করে এসব করতে যাচ্ছে একা মানুষ!

_ আমি বক্স হাতে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ড্রইং রুমে বসে পরলাম। সামনে টিভি আগে থেকে অন ছিল তাই বসে দেখতে লাগলাম। আন্টি দরজা বন্ধ করে ভেতরের দিকে যেতে যেতে বলতে লাগল ফারহান বস আমি আসছি, আজ নাস্তা করে তারপর যাবে। আমি একা বসে আছি তবে অনেকটা স্বস্তি লাগছে। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে মেসেঞ্জারে গেলাম কিন্তু কাউকে নক দিতে ইচ্ছে হল না। বসে বসে ফেসবুকে নিউজফিড দেখতে লাগলাম। দেখতে দেখতে ডাইনিং রুম থেকে আন্টির ডাক…. আন্টিঃ ফারহান এই রুমে আস।

আমিঃ হুম, আসছি আন্টি।

_আমি মোবাইল হাতে নিউজফিড চেক করতে করতে গেলাম। আন্টি বসতে বলল, আমি চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। দেখলাম টেবিলে অনেকের জন্য চা-নাস্তা সাজানো। আমার সোজা সামনের চেয়ারে বসে আছে আন্টির ছোট মেয়ে তন্নি। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিল, আমিও হাসি না দিয়ে থাকতে পারলাম না। এরমাঝে আন্টি তার হাজব্যান্ডকে ডাক দিল… আন্টিঃ কই শুনছ? নাস্তা করতে আস। ফারহান বসে আছে একা একা। একটু আস না, সবাইকে একটু নিয়ে দাও। তন্নি তুমি যাওতো আম্মু তোমার ঐশী আপুকে নাস্তা করতে ডেকে নিয়ে আস।

_নাম শুনে বুঝতে পারলাম মেয়েটির নাম ঐশী। মনে মনে যা নাম ভেবেছিলাম একটাও মেলেনি। তবে ঐশী নামটি আমার খুব পছন্দ হল। এর মাঝে আংকেলের আগমন…. আমিঃ সালাম আংকেল।

আংকেলঃ ওয়ালাইকুম সালাম। কি অবস্থা তোমার? আজ কি অফিস নেই?

আমিঃ না আংকেল আজ আমার ডে-অফ (মাথা নেড়ে বললাম)।

আংকেলঃ আচ্ছা ভালো। তোমার আব্বুর সাথে কথা হয়েছে? ভালো আছেন উনি?

আমিঃ হয়েছিল কয়েকদিন আগে। ভালো আছেন।

আন্টিঃ তন্নিকে পাঠালাম ঐশীকে ডাকতে, কোথায় যে গেল। যাই আমি ডেকে নিয়ে আসি।

_আংকেল টেবিলে রাখা প্লেটে নুডলস দিচ্ছিলেন আমি বার বার শার্টের কলার ঠিক করছিলাম। ইতিমধ্যে ২ গ্লাস পানি খাওয়া শেষ আমার। আমার ডান পাশের রুম থেকে তন্নি দৌড় দিয়ে বের হয়ে এসে টেবিলে বসে পড়ল। আমি তাকিয়ে আছি রুমের দরজার দিকে। প্রথমে আন্টি বের হল পেছনে সেই নীল জামা। আমার সারাদিনের আকাঙ্ক্ষা, অপেক্ষমাণ সেই চেহারাটি দেখলাম। শুধু তাকিয়ে আছি গোলগাল চেহারাটির দিকে যেন অনেক দিনের পরিচিত। একটি মেয়ের চেহারা এত কিভাবে মায়াবী হয়! যা কল্পনা করেছিলাম তার চেয়েও সুন্দর। এসব দেখতে আর ভাবতে ভাবতে সবাই কখন যেন টেবিলে বসে পড়ল টের পেলাম না। মেয়েটি খুবই লাজুক, একটিবারের জন্যও মাথা তুলে তাকাচ্ছে না। টেবিলে নুডলস আর পায়েস সাজানো। নুডলস আমার খুব প্রিয় তাই দেরি না করে খাওয়া শুরু করলাম। আমরা সবাই নুডলস খেতে লাগলাম কিন্তু ঐশী শুধুমাত্র পায়েস। আংকেলঃ ঐশী কি নুডলস খায় না? ওকে পায়েস কেন দিয়েছ আগে?

আন্টিঃ না, ও ঝাল তেমন খেতে পছন্দ করে না। মিষ্টি খেতে ভালবাসে, পায়েস ওর জন্যই তৈরি করলাম। ফারহান তোমাকে আরেকটু দিব নুডলস?

আমিঃ না না যথেষ্ট।

আন্টিঃ তাহলে পায়েস খাও অল্প করে।

আমিঃ আসলে আন্টি আমার এখন মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে না।

আন্টিঃ তোমার আম্মু রোল বানিয়ে পাঠিয়েছে। নাও এখান থেকে খাও।

আমিঃ আন্টি থাক। আমি নিয়ে খাব, আমিতো আর মেহমান না। আপনাদের বাসায় মেহমান এসেছেন উনাকে আগে দেন।

আন্টিঃ ওহ! তোমাকে বলা হয়নি। ও আমার বড় বোনের একমাত্র মেয়ে ঐশী, ওরা ঢাকা থাকে। গতকাল আব্বুর সাথে আমাদের বাসায় এসেছে। আমি ফোনে বলেছিলাম ঐশীকে নিয়ে আসতে, কিছুদিন আমাদের এখানে থাকবে। আমারো একা একা ভাল লাগেনা সারাদিন। কয়দিন পর ওর আব্বু আবারো কি জরুরী কাজে চট্টগ্রাম আসবেন তখন সাথে করে নিয়ে যাবেন।

আমিঃ হুম খুব ভাল করেছেন। খালার বাসায় কিছুদিন থাকলে খুব ভাল লাগবে।

_ঐশী পায়েস খেতে খেতে হঠাৎ মুখে হাত দিয়ে কাশতে লাগল। আমি তাড়াহুড়ো করে গ্লাসে পানি ঢেলে ঐশীর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। এই প্রথম ঐশী আমার দিকে তাকিয়ে গ্লাস টেনে নিল। তার সেই মায়াবী ছোট ছোট চোখ দিয়ে, কপাল কুঁচকে কাশতে কাশতে আমার দিকে তাকানোর মুহুর্ত আমার মাথায় স্ক্রিনশট হয়ে রইল। পানি খাওয়া শেষে আমার দিকে আবারো তাকালো। আমি এবার একটু লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। আংকেলঃ খালি চা খাচ্ছ কেনো? বিস্কিট নাও।

আমিঃ চা খাওয়া শেষ আংকেল। আজকে আমি উঠি। আন্টি আম্মু বলেছেন বক্সটি দিয়ে দিতেন।

আন্টিঃ ওটা আমি দিব পরে। ফারহান তুমি কি ফ্রি আছ সামনে?

আমিঃ কেনো আন্টি কোন সমস্যা?

আন্টিঃ আসলে ঐশীকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে যেতে চেয়েছিলাম। ছেলে কেউ একজন থাকলে সাহস লাগে, এখন বাইরে যা পরিস্থিতি। তোমার আংকেলকে বলেছিলাম, উনি নাকি একদম ছুটি নিতে পারবেন না।

আমিঃ (হাঁটতে হাঁটতে) চিন্তা করবেন না। আমি সামনের রবিবার/সোমবার যেকোনো একদিন ছুটি নিয়ে আপনাকে কনফার্ম করব।

আন্টিঃ ঠিক আছে, থ্যাঙ্কস তোমাকে। খুব উপকার হবে।

আমিঃ (সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে) আচ্ছা অবশ্যই। আংকেল আন্টি আমি আসছি, আপনারা বাসায় বেড়াতে আসবেন। টাটা তন্নি, ঐশী বেড়াতে আসবেন আমাদের বাসায়।

আন্টিঃ আচ্ছা যাবে। ও তোমার কথা শুনবে না। আমি ওকে পরে বুঝিয়ে বলব যে তুমি বেড়াতে যেতে বলেছ। তুমিও আবার বেড়াতে এসো। ভাবীকে আসতে বলিও।

_এই বলে আন্টি দরজা বন্ধ করে দিল। আমি শেষ বাক্যগুলো শুনার পর স্ট্যাচু হয়ে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম সিঁড়ির মেঝেতে। আন্টি কি বলেছে শেষে এসব??? ঐশী কি কথা শুনতে বা বলতে পারে না!!!

***আন্টির শেষ বাক্যটি শুনার পর মাথা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। কোন রকমে বাসায় এসে রুমে ঢুকে হাত পা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম। মনকে শান্ত রাখতে পারছি না, এমন হল কেন? ঐশী আসলে কি শুনতে পায় না? নাকি আমার বুঝতে ভুল হচ্ছে?

_ সবকিছু এলোমেলো অগোছালো লাগছে, মুখের উপর বালিশ চেপে ধরে আছি। কতই না সুন্দর ছিল আজকের সারাদিন, শেষ মুহূর্ত আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আন্টিকে প্রশ্ন করলেই পারতাম ঐশীর ব্যাপারে। শুধু শুধু বোকার মত চলে এসেছি..

_যাই হোক গাধার মত এখন এসব ভেবে লাভ নেই। ঐশী যেমন আছে তেমন, কথা বলতে, শুনতে সমস্যা থাকুক অথবা নাই থাকুক ওর প্রতি আমার ভালোলাগা বেড়েই চলেছে।

_সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। রাতের খাবার শেষে ঘুমানোর খুব চেষ্টা করছি, কিছুতেই ঘুম আসছে না, রাত প্রায় ২টা। কাল অফিস আছে, ঘুম চোখে নিয়ে অফিস করার বাজে অভিজ্ঞতার শিকার আর হতে চাই না তাই ঘুমের ঔষধ খেয়ে মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করে শুয়ে পড়লাম।

_সকালে অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে। আজ অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুম থেকে উঠেই সোজা বেলকনিতে। কেউ নেই….শূন্য বেলকনি আমার দিকে তাকিয়ে ভেংচি দিচ্ছে। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেলাম, এরপর রেডি হয়ে অফিসের দিকে রওনা দিলাম। কিছুতেই মন বসাতে পারছি না কাজে, কাস্টমারদের সাথে উল্টা পাল্টা কথা বলছি। ইচ্ছে করছে এখুনি ছুটে গিয়ে দেখে আসি ঐশীকে। সকাল ৯ টা ৪৫ সময় অফিসে আসলাম এখন দুপুর ১ঃ৫০। দুপুরের খাবারের ব্রেক-এ আছি। লাঞ্চ শেষে আর ধৈর্য ধরতে পারলাম না, পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল দিলাম আন্টিকে। রিং হচ্ছে………. আমিঃ হ্যালো সালাম আন্টি, আমি ফারহান। কেমন আছেন আন্টি?

আন্টিঃ হ্যাঁ ফারহান চিনতে পেরেছি, নাম্বার সেভ ছিল তোমার। ভালো আছি আমরা। তুমি ভালো আছ? লাঞ্চ করেছ?

আমিঃ ভালো আন্টি, খেয়েছি। আন্টি আমি কল দিয়েছি কারণ আপনি আমাকে একটু সময় দিতে বলেছিলেন। আপনারা কি আজ বের হতে পারবেন?

আন্টিঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পারব। তুমি কি আজ অফিস যাওনি?

আমিঃ আমি অফিসে আন্টি, বিকেলের সময়টি ছুটি নিতে পারব।

আন্টিঃ ঠিক আছে তুমি বিকেল ৪টায় আমাদের বাসার সামনে চলে এসো। আমরা একসাথে বের হব। পারবে?

আমিঃ ঠিক আছে আন্টি। আমি ঠিক ৪টায় আপনাদের বাসার সামনে থাকব। সালাম আন্টি, আল্লাহ হাফেজ।

_কল কেটে দিয়ে মোবাইল শক্ত করে চেপে ধরে লম্বা একটি শ্বাস ছাড়লাম। তারপর আর কি, খুশিতে উচ্চস্বরে ইয়া-হু!!! বলে ২ হাত উপরের দিকে তুলে দিলাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি লাঞ্চ রুমের সবাই আমার দিকে হা…. করে তাকিয়ে আছে। সানিঃ ফারহান তুমি ঠিক আছ? (অফিসের কলিগ)

আমিঃ হ্যাঁ, আমি একদম ঠিক।

_নিজেকে সামলে নিলাম। একটু পর স্যারের রুমে গিয়ে ছুটি নিলাম। স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক খুব ভাল তাই কোন প্রশ্ন না করে আমাকে ছুটি দিয়ে দিলেন কারণ স্যার জানেন বিশেষ প্রয়োজন বশত আমি কখনো ছুটি চাই না।

_ঘড়িতে বিকেল ৩ টা ৪৬ মিনিট। অফিস থেকে বের হয়ে রিক্সায় উঠে সোজা আন্টির বাসার দিকে রওনা দিলাম। একটু পর পর রিক্সা চালককে বলছি ‘মামা তাড়াতাড়ি চালান’, কেন জানি পথ শেষ হচ্ছে না। অবশেষে অধৈর্যপূর্ণ পথের অবসান ঘটিয়ে আন্টির বাসার সামনে এসে পৌঁছালাম। রিক্সাকে বিদায় করে গেইটের ভেতর তাকাতেই দেখি সবাই রেডি হয়ে আমার অপেক্ষায়।

_দৃষ্টি গেল ঐশীর দিকে, মুচকি হেসে দিল ঐশী। গতকাল না হয় ম্যাচিং করে ড্রেস পড়েছিলাম কিন্তু আজ ঐশীর সাথে প্রথম সাক্ষাত, ২ জনেই আজ সাদা রঙের জামা পরলাম। কি অদ্ভুত মিল!! খেয়াল করলাম খুব বেশি সাজগোজ করেনা মেয়েটি, নরমাল থাকে আর ওটাই সবচেয়ে ভালো মানায় ঐশীকে। আমি, আন্টি, ঐশী এবং তন্নি দাঁড়িয়ে আছি সিএনজি এর অপেক্ষায়। আমিঃ আন্টি কোথায় যাবেন ভেবেছেন?

আন্টিঃ দূরে কোথাও না। পাশে যে খোলা পার্ক আছে ওখানেই যাব। একটু হাঁটাচলা ঘুরাঘুরি করে বাসায় চলে আসব। তোমার আংকেল আবার অফিস থেকে এসে চিল্লাচিল্লি করবেন।

আমিঃ আর তানিম? (আন্টির বড় ছেলে)

আন্টিঃ তানিমকে বলেছি স্কুল থেকে ফিরলে তোমাদের বাসায় যেতে। বাসায় ফিরলে আমি বেলকনি দিয়ে ডেকে নিব।

_একটি সিএনজি থামিয়ে সবাইকে পেছনে বসিয়ে দিয়ে আমি সামনে বসে পড়লাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম পার্কে। আজ পার্ক অনেকটা খালি। খালি থাকা স্বাভাবিক কারণ আজ রবিবার, ছুটির দিনগুলোতে একটু বেশি জমজমাট থাকে। ভালো হয়েছে আমার এত গেদারিং ভাল লাগে না। দু’পাশে লম্বা লম্বা ঘাস আমরা সবাই মাঝখানে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম। আমি আন্টি নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছিলাম। আন্টি একটু বাচাল টাইপের, কথা বলতে গেলে আর ছাড়াছাড়ি নেই কিন্তু আমি কথা ঘুরিয়ে বার বার ঐশী প্রসঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। পার্কে হাঁটাচলা করছি প্রায় ১৫ মিনিট কিন্তু এখনো পর্যন্ত ঐশী চুপচাপ তাই আমার বুঝতে আর বাকি রইল না কিছু….। আমিঃ আন্টি ঐশীর আম্মু কি একদম আসে না আপনাদের বাসায়?

আন্টিঃ না। উনি অসুস্থ, ডায়াবেটিস অনেক হাই। তেমন দূরে কোথায় যায় না, চট্টগ্রামের কথা বাদ-ই দিলাম। আমার সাথে শেষ দেখা হয়েছে বছর খানেক আগে ঢাকায় আমাদের বড় ভাইয়ের মেজ ছেলের বিয়েতে। তাছাড়া এখন আধুনিক যুগ, ভিডিও কলে কথা হয় ২-১ দিন পর পর।

_এসব বলতে বলতে আন্টি হাঁপিয়ে উঠে বলল, ফারহান আমি আর হাঁটতে পারছি না। আমি একটু এখানে বসছি তন্নিকে নিয়ে তোমরা ঘুরে এস। দূরে কোথায় যেও না। আমিঃ ঠিক আছে আন্টি আপনারা বসেন, বিশ্রাম করেন। আমি ঐশীকে সামনে কাশফুলে প্রজাপতি আর ফড়িং এর মেলা দেখিয়ে নিয়ে আসছি।

_এ বলে আমি ঐশীকে ইশারা দিয়ে আমার সাথে হাঁটতে বললাম। ঐশী মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। ২ জন হাঁটছি শূন্য পথে, সে এক অন্যরকম অনুভূতি। চলতে চলতে আমি ইশারা দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম নানা সৌন্দর্যপূর্ণ স্থান, দেখিয়ে দিচ্ছিলাম নানা রং-বেরঙের পাখি, বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম আমি সময় কাটাতে মাঝেমধ্যে এখানে ঘুরতে আসি, এখানে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু। যদিও আমি অঙ্গভঙ্গিতে বুঝাতে এত দক্ষ না তবে চেষ্টার কমতি ছিল না। আমি বুঝিয়েই যাচ্ছি আর ঐশী মুচকি হেসে চলেছে। _আশে পাশে কয়েকজোড়া কাপল দেখতে পেলাম, প্রথমে আমি খেয়াল করিনি ঐশী আমাকে ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দিল আর লাভ ক্যাপশন দিয়ে দেখিয়ে দিল এরা কাপল। সেই অনেক্ষন যাবৎ ২ জন মুচকি হাসছি আর অঙ্গভঙ্গিমায় কথা বলছি আদিম মানুষের মত। সত্যি বলতে গেলে খুব ভালই লাগছিল, নতুন এক্সপেরিয়েন্স। _কাশবনে এসে আমি আঙুল দিয়ে নানা রঙের প্রজাপতি দেখিয়ে দিচ্ছিলাম আর চেষ্টা করছিলাম ফড়িং ধরার জন্য। আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে খেয়াল করলাম আমার এসব কাণ্ড দেখে ঐশী হেসে চলেছে।

_এরপর হঠাৎ আচমকা হৃদয় স্পন্দিত সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্ত……. ঐশীর হাতে থাকা ছোট ব্যাগের ভেতর রিং বেজে উঠল। ঐশী তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বের করে কানের সাথে লাগিয়ে বলল ”হ্যালো,…. জ্বী খালামনি। আমরা পাশেই আছি, হুম চলে আসছি।” _ঐশীর এই ১৫ সেকেন্ডের ছোট ঘটনাটি আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। সবকিছু যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে, নিজের গায়ে চিমটি কেটে কনফার্ম হলাম। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি…

_আবারো ঐশীর মিষ্টি কন্ঠ আমার কানে এসে আঘাত হানল.. ঐশীঃ ”হ্যালো শুনছেন? আপনি এত গভীর হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছেন? খালামনি যেতে বলছেন। আংকেল নাকি আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাসায় ফিরবেন। চলেন…….. কি হল?? আসেন….আপনার চোখ ভেজা হয়ে আছে কেন?

আমিঃ ঐশী.. আপনি.. আপনি.. অহ মাই গড। আপনি কথা বলতে পারেন?

ঐশীঃ কেন পারবোনা? আপনি সেই কখন থেকে আমার সাথে ইশারায় কথা বলে যাচ্ছেন। আমি সব সহ্য করে আপনার এসব আজগুবি কাণ্ড দেখছিলাম। আপনি এসব করে আমার সাথে মজা নিচ্ছিলেন তাই না? তাই আমিও মজা করছিলাম।

আমিঃ না না। বিশ্বাস করেন আমি মজা নিতে যাব কেনো? আপনি এই ২টা দিন কথা বলেননি কেনো আমার সাথে? আপনার কথা বলা দেখে আমার যে কি ভালো লাগছে আমি আপনাকে বুঝাতে পারব না।

ঐশীঃ হা হা হা। কি যে বলেন! একজন মানুষ কি কথা বলতে পারে না? এখানে ভাল লাগার কি আছে, আমিতো আগে থেকেই কথা বলতে পারতাম। আর আপনার সাথে কখনো কথা বলার সুযোগ হয়নি তাই বলিনি। তাছাড়া আমি শান্ত প্রকৃতির, চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলিনা। আর আপনার কেন মনে হল আমি কথা বলতে পারি না? হ্যাঁলো আপনি আপনার চুল ছিড়ে ফেলবেন এত টানাটানি করলে..

আমিঃ ওহ! সরি। আসলে আমি একটু বেশি এক্সাইটেড হয়ে আছি তাই। গতকাল আন্টির বাসায় নাস্তার টেবিলে আপনি একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি তাছাড়া, আন্টি আমাকে কেন বলেছেন আপনি শুনবেন না, যখন আপনাকে আমাদের বাসায় আসার জন্য বলে যাচ্ছিলাম।

ঐশীঃ হা হা। আচ্ছা আপনি অল্প কিছুতেই এত সিরিয়াস হয়ে যান কেনো? আমি আগেই বলেছি আমি চুপচাপ থাকতে ভালবাসি। আপনি বাসা থেকে যখন আন্টির সাথে কথা বলতে বলতে বের হয়ে যাচ্ছিলেন আমি তখন ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিলাম। যখন হয়তো আপনি আমাকে আপনাদের বাসায় যেতে বলছিলেন তখন আমি ওয়াশরুমের ভেতরে ছিলাম বলে শুনতে পাচ্ছিলাম না বলে আন্টি আমাকে পরে বলবে বলেছেন।

আমিঃ ওহ আল্লাহ! তাই বলে এভাবে বলতে হবে নাকি? যে, ‘ আমি পরে বুঝিয়ে বলব’।

ঐশীঃ আসলে আমি কারো বাসায় যেতে চাই না তাই হয়তো যাওয়ার জন্য আমাকে বুঝিয়ে বলার কথা বলেছেন। এই জন্যই এমন করে বলেছেন। চলেন যেতে যেতে কথা বলি, খালামনি অপেক্ষা করছেন।

আমিঃ ওহ খোদা!! কি হচ্ছে এসব!!.. হুম চলেন।

_এরপর সামনে পাওয়া এক বাদামওয়ালার কাছ থেকে ১০ টাকার বাদাম নিয়ে ২ জন খেতে খেতে চলতে লাগলাম…… আমিঃ আপনি জানেন গতকাল একটি ছেলে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখার জন্য কত বাহানা করেছে।

ঐশীঃ হ্যাঁ, জানি। ইচ্ছে করেই আমি ওইদিকে ফিরে তাকাইনি।

আমিঃ কেনো?

ঐশীঃ কেন তাকাতে যাব? ছেলেটাকে আমি চিনি নাকি?

আমিঃ উফ, ইচ্ছে করছে আপনাকে ২টা থাপ্পড়….. বেলকনির ছেলেটা আমি ছিলাম।

ঐশীঃ ওটা পরে জানতে পেরেছি। ওটা আপনি ছিলেন আর বেলকনি আপনাদের।

আমিঃ কিভাবে জানলেন?

ঐশীঃ আন্টি বলেছেন আজ সকালে ওটাই আপনাদের বাসা। আরো অনেক কিছুই বলেছেন।

আমিঃ আর কি বলেছেন?

ঐশীঃ তেমন কিছুই না। আপনাদের ফ্যামিলিতে কে কে আছেন। আপনি কি করেন এসব।

আমিঃ ওহ, ভালো হলো। আমাকে নিজে থেকে কিছু বলতে হচ্ছে না। আচ্ছা আপনি কি করেন?

ঐশীঃ আমি আপনার মত জব করিনা, তবে একটি টিউশনি করি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ২য় বর্ষে আছি। আচ্ছা আপনি আজ সাদা কালারের শার্ট পড়েছেন কেনো? নিশ্চয় আমার সাথে ম্যাচিং করে তাই না?গতকাল নীল আর আজকে সাদা। সত্যি বলতে শার্ট -টি ভালোই মানিয়েছে আপনাকে।

আমিঃ থ্যাঙ্কস। আপনাকেও অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে সাদা রঙের থ্রি-পিচে। আর হ্যাঁ গতকাল পড়েছিলাম ম্যাচিং করে কিন্তু আজ কিভাবে হল জানি না।

ঐশীঃ ঢং।

আমিঃ সত্যি জানিনা। যাই হোক আপনি অনেক ভাল স্টুডেন্ট, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। আমি পড়েছিলাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঐশীঃ ধুর, ওসব কিছু না, সব ভাগ্যে। আমি পড়ালেখায় ঘোড়ার ডিম।

আমিঃ হা হা, ঘোড়ার ডিম কি হয়?!!

ঐশীঃ হুম…. হয়তো।(হাসতে হাসতে) দেখেন এখানে কত কাপল, আপনি নিশ্চয় ভাবীকে অনেক মিস করছেন।

আমিঃ ভাবি!…. নাহ, এখনো আমার লাইফে আসেনি (হেসে দিয়ে)। আপনার বয়ফ্রেন্ড আছে?

ঐশীঃ হুম আছে, নাম আশিক। একি এলাকায় থাকি আমরা। আমাদের রিলেশন আজ প্রায় ৪ বছর।

আমিঃ তাই…?? আশিক অনেক লাকি। কি করে আশিক?

ঐশীঃ নিজে কিছু করেনা। বাবার বড় বিজনেস আছে, এসব দেখাশুনা করে।

_ঐশীর এত সহজে বলে ফেলা বাক্যগুলো আমার কাছে খুবই কষ্টকর ছিল যদিও আমি হাসি মুখে সব শুনে যাচ্ছিলাম। এরপর আমি তাদের ছবি দেখার জন্য অনুরোধ করলাম। ঐশী তার মোবাইলে তাদের বেশ কয়েকটা ছবি আমাকে দেখালো। আমিঃ মাশাল্লাহ। খুব ভাল মানিয়েছে আপনাদের। বিয়েতে আমাকে অবশ্যই দাওয়াত করবেন।

ঐশীঃ অনেক অনেক থ্যাঙ্কস আর অবশ্যই দাওয়াত করব। দোয়া করবেন আমাদের জন্য। সম্ভবত আমি আগামীকাল ঢাকা চলে যাব, আব্বু কাল আসবেন চট্টগ্রামে অফিসের কাজে। আপনার নাম্বারটি কাইন্ডলি দিবেন মাঝেমধ্যে খবর নিব। তাছাড়া আপনিতো কাস্টমার কেয়ারে জব করেন তাই মাঝে মাঝে বিরক্ত করব প্রবলেমে পড়লে।

আমিঃ হুম অবশ্যই, অবশ্যই করবেন। আমার নাম্বার রাখেন। আমরা আন্টির অনেক কাছে চলে এসেছি।

ঐশীঃ আচ্ছা আমরা কি ভালো ফ্রেন্ড হতে পারি না?

আমিঃ কেন নয়? অবশ্যই পারি।

ঐশীঃ ওকে, ঠিক এখন থেকে আমরা ফ্রেন্ড এবং এখন থেকে আমরা তুমি করেই বলব।

আমিঃ হুম, বলা যায়।

ঐশীঃ বলা যায় মানে? আমি কিন্তু অনেক খুশি তোমার মত একজন বন্ধু পেয়ে। আমার এই মুহুর্তগুলো সারাজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে বিশেষ করে তোমার পাগলামিগুলো। ধুর… ভুল হয়ে গেল, ভিডিও করে রাখা দরকার ছিল তোমার পাগলামি।

আমিঃ হা হা। নেক্সট টাইম আবার বেড়াতে আসলে তখন করিও। আরেকটা কথা, আমার এসব বোকার মত কাজ কারো সাথে শেয়ার করবেন না প্লিজ। আমি আসলেই লজ্জিত।

ঐশীঃ আবার আপনি আপনিতে চলে গিয়েছ কেনো? বলেছি তুমি করে বলতে। এমন করলে কিন্তু আমি সবাইকে বলে দিব।

আমিঃ সরি সরি। এই যে কানে ধরলাম সরি। আর এমন হবেনা। তুমি তুমি তুমি ৩ বার বললাম।

ঐশীঃ ওকে, এখন ঠিক আছে। ঢাকায় আসলে অবশ্যই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসবে প্রমিস কর।

আমিঃ প্রমিস প্রমিস প্রমিস।

ঐশীঃ থ্যাঙ্কস। ভালো থেকো ফারহান।

আমিঃ তুমিও। ঐশী……

_এরপর আন্টির সামনে সামনে আসতেই ঐশী আবারো চুপচাপ হয়ে গেল। বুঝলাম মেয়েটি সবার সামনে ফ্রি থেকে কথা বলতে বা আড্ডা দিতে ইচ্ছুক না। বাসায় যাওয়ার সময় সিএনজি-র সামনে বসে লুকিং গ্লাসে বার বার ঐশীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করার ট্রাই করছিলাম কিন্তু ঐশী চোখ বাঁকা করে বার বার বুঝিয়ে দিচ্ছিল পাশে আন্টি আছেন।

বিদায় শেষে বাসায় ফিরে অনেক ভেবেছি, অনেক চিন্তা করেছি। ঐশীকে আমার ভালো লাগত কিন্তু এটা ভালোবাসা ছিল না। এই ২ দিন প্রচন্ড আবেগ আমাকে ঘিরে রেখেছিল। যেভাবেই হোক ঐশীকে আমি পেয়েছি, ভালো বন্ধু হিসেবে পেয়েছি। ঐশী যখন আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করছিল তখন তার প্রাণবন্ত চেহারায় আমি যে হাসি-খুশি খুঁজে পেয়েছি হয়তোবা তাকে আমি কাছে পেলেও এতটা সুখী দেখতাম না।

_রাতে ঘুমানোর আগে ঐশীর সাথে ফোনে কথা হয়েছিল অনেকক্ষণ। অনেক ফ্রেন্ডলি কথা বলেছিলাম আমরা সাথে মজার মজার ঘটনা শেয়ার করেছিলাম আর প্রাণভরে ইচ্ছেমত হেসেছিলাম। আশিকের ব্যাপারে অনেক শুনলাম ঐশীর মুখে, শুনে অনেক কিছুই শিখলাম। ভালোবাসা আর ভালোলাগা এক বিষয় না। আশিকের সামনে আমার এসব আবেগময় চিন্তা কিছুই না, আশিক অনেক বেশি ভালোবাসে ঐশীকে তাইতো প্রকৃতি ঐশীকে আশিকের নিকট উপহার দিয়েছে। প্রকৃতির নিয়মই সঠিক, আমি ভুল ছিলাম।

_’বন্ধুত্ব’ এই ছোট শব্দটির মাঝেও লুকিয়ে থাকে অনেক কিছুই যা ঐশীর সাথে না মিশলে আমি কখনো বুঝতে পারতাম না।

_পরদিন অফিসে আমার মোবাইলে মেসেজ আসল ঐশীর নাম্বার থেকে – ”ফারহান আমি চলে যাচ্ছি, আব্বু এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। তুমি ভাল থেকো। খুব মিস করব তোমাকে।” ঐশীর এসএমএস পেয়ে খুব কষ্ট হচ্ছিল। জানিনা আর কখনো দেখা হবে কিনা আমাদের!! শত কষ্টের মাঝেও হেসে দিয়ে স্রষ্টার নিকট প্রার্থনা করলাম ঐশীকে তুমি ভালো রেখো, সুস্থ রেখো, সুখে রেখো এবং সারাজীবন আমাদের বন্ধুত্ব অটুট রেখো।

Written by Farhad Asif

Related Posts

যুক্তি

যুক্তি

তুর্য কমিউনিস্ট মা বাবার একমাত্র সন্তান। তুর্যের বাবা মুসলিম থেকে নাস্তিকে কনভার্ট হয় ২২ বছর বয়সে। তারপর সমাজের চাপে নিজ স্থান ছেড়ে চলে যায় অনেক দূরে। সেখানে ২৭ বছর বয়সে বিয়ে করে তার নাস্তিক এক বান্ধবীকে। ২ জনের সংসারে খুব আদর যত্ন আর ভালোবাসায় বেড়ে উঠে তুর্য। তুর্যের...

read more
মুখোশ

মুখোশ

আর মাত্র ২ ঘণ্টা বাকি। গতকাল হঠাৎ রেডিওতে এক সংবাদে গ্রামের সবাই শুনতে পেয়েছিল, আজ শুক্রবার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা একটি প্রকাণ্ড গ্রহের সাথে পৃথিবীর ধাক্কা হবে। এতে পৃথিবী ক্ষণিকের মাঝেই ধ্বংস হয়ে যাবে।এখন সকাল ৫:৩০ মিনিট... ফজরের নামাজ পড়ে বের হয়ে কেউ কেউ ছুটোছুটি...

read more
অসমাপ্ত মীম

অসমাপ্ত মীম

সিয়াম কি পারবে এই পরিস্থিতিতে মীমকে বিয়ে করতে? অথবা তার কী করা উচিত? আসলে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলে যে কেউ সঠিক সিদ্ধান্ত খুঁজে নিতে ভেঙে পড়বে.........কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাই তো?? না-বোঝারই কথা। হুট করে কেউ কি আর পরামর্শ দিতে পারে? প্রথম থেকেই শুরু করি, খুব...

read more

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *