আর মাত্র ২ ঘণ্টা বাকি। গতকাল হঠাৎ রেডিওতে এক সংবাদে গ্রামের সবাই শুনতে পেয়েছিল, আজ শুক্রবার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা একটি প্রকাণ্ড গ্রহের সাথে পৃথিবীর ধাক্কা হবে। এতে পৃথিবী ক্ষণিকের মাঝেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
এখন সকাল ৫:৩০ মিনিট…
ফজরের নামাজ পড়ে বের হয়ে কেউ কেউ ছুটোছুটি করছে, অনেকে এখনো মসজিদের ভেতরে কান্নাকাটি-বিলাপ করছে।
পাশের ছোট হিন্দু পাড়া থেকে সেই গত রাত থেকে টানা পূজার ধ্বনি আসতেই লাগল।
করিম চাচার দোকান ফ্রিতে খোলা রয়েছে গতকাল সংবাদের পর থেকেই, যে যা খুশি নিয়ে যাচ্ছে–খাচ্ছে। বলতে গেলে যতটা না খেয়েছে তার চেয়ে বেশি নষ্ট করা হয়েছে, বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা।
সবাই দেউলিয়া হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে লাগল পরস্পর থেকে।
কাকলী তার স্বামীর পা ধরে কান্না করতে করতে বলে উঠল,
— ‘ওগো, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি অনেক বড় পাপ করেছি তোমাকে না জানিয়ে।’
— ‘কি করেছ তুমি? তোমাকে আমি অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি।’
— ‘ওগো, এই যে আমাদের সন্তানটি দেখছো না? ওটা তোমার না! পাশের গ্রামের মফিজের…’
— ‘কি!!! তোকে আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম। এখন থেকেই তালাকপ্রাপ্ত তুই। এক তালাক… দুই তালাক… তিন তালাক…’
গ্রামের জ্বিন তাড়ানো, তাবিজ–কবজ করা হুজুরটি এবার সবার সামনে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে উঠল,
‘সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন, আমি আসলে এসব কিছুই করতে পারি না। আমার নিকট আলাদা কোনো শক্তি নেই। আমি শুধু আপনাদের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে আপনাদের সাথে ধোঁকাবাজি করতাম আর টাকা হাতিয়ে নিতাম।’
সবাই অতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে…
গ্রামের মাতব্বর–বিত্তবানরা তাদের কৌশলের কথা জানিয়ে গরিব–দুঃখীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা–কড়ি আদায় করার কথা স্বীকার করে সবার নিকটে ক্ষমা চেয়ে চলল… গ্রামের সর্দার কালো হাওলাদার স্বীকার করল তার সব অন্যায়–অবিচারের দিনগুলোর কথা।
২ বছর আগে ফাঁসিতে ঝুলে গোলাপির আত্মহত্যার কারণ জানা গেল অবশেষে। রাজু তার নিজের মুখে স্বীকার করল গোলাপি কেন তার পেটে বাচ্চাসহ আত্মহত্যা করে। রাজু পূর্বে বিয়ের জন্য রাজি থাকলেও পরে অসম্মতি জানালে ১৫ বছরের গোলাপি রাতের আধারে এই কাজটি করতে বাধ্য হয়।
এসব নানা রহস্য উদ্ঘাটন আর সত্য উন্মোচনের মাধ্যমে ভিন্ন হয়ে উঠতে লাগল গ্রামের পরিবেশ। এমনকি ধর্ম এবং সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটি ব্যাখ্যা দিতে থাকে তাদের হাজার হাজার টাকার লুটপাটের… কৃষিজমির লাউ চুরি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পাপ স্বীকারের মাধ্যমে কান্নার ধুম পড়ে গেল গ্রামে…
এদিকে ঘড়িতে আর মাত্র চার–পাঁচ মিনিটের মতো বাকি। কেউ কেউ সেজদায় পড়ে আছে, কেউবা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার চোখে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। অনেকে আবার কালেমা পড়ছে, অনেকেই মোনাজাতে শেষ মুহূর্তের প্রার্থনা করেই চলেছে। গ্রামের লোকদের এমন অদ্ভুত কাণ্ড–কারখানা দেখে পোষা প্রাণী আর কুকুরগুলো ছোটাছুটি আর ডাকাডাকি শুরু করছে।
সময় গড়িয়ে আরো ১০ মিনিট ওভার, কিন্তু এখনো কিছুই ঘটেনি। আশেপাশের পরিবেশ খুবই স্বাভাবিক।
সবার চোখে–মুখে চিন্তার ছাপ। অনেকেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। করিম চাচা তার দোকানের কোনায় ফেলে রাখা রেডিওটি পুনরায় চালু করে মেঝেতে রাখল।
শোনা যাচ্ছে ব্রেকিং নিউজ—
‘নাসার সূত্র থেকে জানানো হয়েছে, পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহটি আজ রাত ০৩:৫০ মিনিটে নিজ কক্ষপথ থেকে ছুটে গিয়ে পৃথিবীর পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এতে সবাইকে নির্ভয়ে এবং শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।’
এ খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের চারদিকে। সবাই লজ্জাজনক কথা মনে করে আপন আপন কাজে চলে যেতে লাগল।
মসজিদ থেকে ইমাম সাহেব বের হয়ে সবার উদ্দেশে বলল,
‘আল্লাহকে ভয় করো, এটি পৃথিবী ধ্বংসের দিন ছিল না। এটি ছিল মূলত পাপীদের মুখোশ উন্মোচনের দিন।’





0 Comments