বড় আপু ঢাকায় থাকে আজ অনেক বছর যাবৎ তাই এখন বড় আপু না বলে আমরা মজা করে ঢাকাইয়া আপু নামেই ডাকি। আপুর স্বামী সরকারি চাকুরী চাকুরীজীবী। বিয়ের পর পরই ভাইয়ার বদলি হয় ঢাকায়, তখন থেকে এখনো পর্যন্ত ওখানেই সংসার। আপুর ২ ছেলে। বড় ছেলে JSC পরীক্ষা শেষ করেছে মাত্র, আর ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণীতে।
_আমি রায়হান, চট্টগ্রামের একটি ছোট গ্রামে আমার বেড়ে উঠা। এখনো গ্রামেই আছি। SSC পাশ করার পর আর লেখাপড়া করা হয়নি। ২ বন্ধু মিলে মোবাইল সার্ভিসিং এর একটি দোকান খুলেছি সাথে আমি সন্ধার পর ২টি টিউশনি করি।
_এবার আপু কল দিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে বসল। আমাকে অবশ্যই ঢাকায় বেড়াতে যেতে হবে, না গেলে আমার সাথে আর কথায় বলবে না। রাগ করবেইতো, সেই ২-৩ বছর আগে গিয়েছিলাম আর যাওয়া হয়নি। ভাবলাম সত্যিই তো অনেক দিন যাওয়া হয়না, যাই ঘুরে আসি।
পরদিন সকালে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্য । দুপুর নাগাত পৌছালাম আপুর বাসায়। আপু আমাকে দেখে অনেক খুশি, ভাগ্নে গুলো অনেক বড় হয়েছে আগের থেকে।
খুব টায়ার্ড ছিলাম তাই দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
রাতে খাবার শেষে আমি আর সিফাত(আপুর বড় ছেলে) বসে আছি ড্রইং রুমে অন্যরা সম্ভবত ঘুমিয়েছে। আমি টিভি দেখছিলাম আর সিফাত কানে হেডফোন লাগিয়ে কথা বলতে বলতে মোবাইলে কি যেন করছিল।
আমিঃ সিফাত…শুনতে পাচ্ছিস ?
সিফাতঃ হ্যাঁ মামা, গেইমস খেলছিলাম PUBG। বলো……
আমিঃ পরীক্ষা কেমন হল তুর?
সিফাতঃ খুব ভালো হয়েছে মামা। আম্মু বলেছে ভালো রেজাল্ট করলে আমাকে একটি দামী ল্যাপটপ কিনে দিবে।
আমিঃ তাই?
সিফাতঃ হ্যাঁ মামা, আরো অনেক কিছু। আচ্ছা মামা তুমি যখন পরীক্ষা দিয়েছ তোমার আম্মু কি কিনে দিয়েছিল?
আমিঃ আমি যখন SSC পরীক্ষা দিচ্ছিলাম তখন আম্মু একটি সাইকেল কিনে দেবে বলেছিল কিন্তু পরে আর দেয়নি।
সিফাতঃ কেনো?
আমিঃ পরে বুঝলাম পরীক্ষায় ভালো করার জন্য এমন বলেছিল। আমিও পরে তেমন কিছু বলিনি কারণ সাইকেলের অনেক দাম ছিল।
সিফাতঃ তাহলে স্কুল যেতে কিভাবে! রিক্সা করে?
আমিঃ আরে নাহ, হেঁটে যেতাম।
সিফাতঃ ওহ! স্কুল maybe পাশেই ছিল তাই না ?
আমিঃ আরে না, অনেক দূর…… প্রায় ২ কি.মি.।
তারপর বল, কেমন কাটে তুর দিনকাল?
সিফাতঃ কি আর মামা…. সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরে বিকেলবেলা কোচিং, বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়। রাতে আবার একজন টিচার আসেন আমাদের পড়াতে।
এভাবেই কেটে যায় সময়।
আমিঃ ওহ আল্লাহ!! সারাদিন পড়ালেখা নিয়ে এত ব্যস্ততা!! তুই খেলাধুলা করিস না?
সিফাতঃ করি, মাঝেমধ্যে শুক্রবারে মাঠে যায়। আশেপাশে মাঠ নেই, অনেক দূরে যেতে হয়। এমনিতে বাসায় খেলি সময় পেলে।
আমিঃ বাসায় কি আর খেলা যায় সব কিছু?
সিফাতঃ হুম মামা, সব আছে মোবাইলে। COC, PUBG, CRICKET, FOOTBALL, FIGHT সবই খেলা যায়।
আমিঃ কি আজব তুদের লাইফ! আমরা প্রতিদিনই খেলতাম ঘরের সামনে বিশাল উঠানে। কখনো কানামাছি, কখনো হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট অথবা কানা কানি ইত্যাদি হরেক রকমের খেলা। তবে ছেলেদের প্রিয় ছিল মারবেল খেলা আর মেয়েদের পুতুল বিয়ে। আমরাও ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম কিন্তু মোবাইলে নয়, মাঠে।
দিন দুপুরে অথবা স্কুলে যাওয়ার আগে পুকুরে গোসলের সময় ইচ্ছেমত লাফালাফি করতাম, পানিতেও খেলতাম অনেক রকম খেলা। গ্রামের মুরুব্বীগণ বকা দিলে কেও ডুব দিয়ে থাকতো কিউবা উঠে দৌড় দিতাম।
সিফাতঃ ohooo! অনেক মজা করতে তোমরা। আমিতো সাঁতার কাটতেও জানিনা।
আমিঃ কি বলিস! গ্রামের একদম ছোট বাচ্চারাও সাঁতার পারে। সবচেয়ে মজা হত শীতের সময়। তড়িঘড়ি করে গোসল করে সারাদিন রোদের পেছনে ছোটাতাম, ঘুড়ি উড়াইতাম। শেষ বিকেলে ঘরের উঠানে বিশাল খড়ের গাদায় ইচ্ছেমত লাফালাফি করে সন্ধায় পুকুরে ফ্রেস হওয়ার সময় হাতে পায়ে অনেক চুলকাইতাম। শীতের তাপমাত্রা বেশী হলে মাঝেমধ্যে উঠানে খড়-খুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সবাই গোল করে বসে থাকতাম। কখনো কখনো আগুন শেষ হয়ে আসলে ধান ছিটিয়ে দিতাম খৈ ফুটানোর জন্য। তাছাড়া কেউ কেউ রাতে লুডু ঘর নিয়ে জমিয়ে খেলায় বসত।
সিফাতঃ wow! অনেক interesting। আমিও লুডু স্টার খেলি মোবাইলে।
আমিঃ হা হা ভাগ্নে। তোদের সবকিছুই এখন মোবাইলে আর আমাদের ছিল বাস্তবে। অবশ্য আমাদের সময় মোবাইল available ছিলই না। সারা গ্রাম মিলে ২-৪ জনের কাছে ছিল নরমাল ফোন।
সিফাতঃ so sad মামা। তাহলে তোমরা মোবাইল ব্যবহার করতে পারনি।
আমিঃ sad না ভাগ্নে। তুরা এখন আড্ডা দেস ম্যাসেঞ্জারে আর আমরা দিতাম খেলার মাঠে অথবা পুকুর ঘাটে। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট ঝগরা হত কিন্তু ৫ মিনিট পর সব ভুলে গিয়ে আবার মেতে উঠতাম হৈ হোল্লোতে। এক পাড়ার সাথে অন্য পাড়ার ফুটবল ম্যাচের প্রতিযোগিতা এমন তীব্র হত আমাদের, মনে হয় বিশ্বকাপকেও হার মানাবে।
সিফাতঃ just awesom! মামা…. গ্রামের লেখাপড়া কেমন ছিল মামা?
আমিঃ ভালই ছিল। সকাল ১০টায় ক্লাস শুরু হত দুপুরে ১ঘন্টা টিফিন ব্রেক তারপর বিকেল ৪টায় শেষ হত। সন্ধ্যার পরে সবাই ঘরে বসে স্কুলের পড়া রেডি করতাম। আমাদের সহপাঠিদের মধ্যে যারা লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছে তাদের মাঝে এখন কিউ ভালো ডাক্তার আবার কিউ কিউ ইঞ্জিনিয়ার।
আচ্ছা ভাগ্নে….তুই কি কখনো স্কুল পালিয়েছিস?
সিফাতঃ স্কুল পালানো মানে কি মামা!??
আমিঃ অর্থাৎ… তুর স্কুল যেতে ইচ্ছে না করলে স্কুল যাওয়ার ভান করে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলি কখনো ?
সিফাতঃ স্কুল যেতে মন না চাইলে যাবনা। পালানোর কি আছে এখানে?
তুমি কি স্কুল চুরি করেছ মামা?
আমিঃ হুম, অনেকবার করেছি। আমাদের সময় এমন ছিল যে, স্কুলে যেতেই হবে বন্ধ ব্যতীত। না গেলে আম্মুর বকার সাথে মার একদম ফ্রি। তাই পড়া না শিখতে না পারলে স্কুল শিক্ষকের ভয়ে অনেক সময় আমরা কয়েজন বন্ধু মিলে স্কুল যাওয়ার ভান করে চলে যেতাম দূরে কোথাও আবার ঠিক সময়ে বাসায় হাজির। যদিও পরের দিন স্কুলে ঠিকই মার খেতাম absence এর জন্য।
সিফাতঃ হা হা নানুকে তুমি খুব ভয় পেতে। মামা… তোমরা সবচেয়ে বেশি মজা করতে কখন?
আমিঃ বর্ষাকালে….। স্যান্ডেল হাতে নিয়ে প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত তুলে ছাতা হাতে স্কুলে যেতাম কিন্তু ছুটি হলে ইচ্ছে করেই ভিজে ভিজে আসতাম। ঘরে ফিরে ভেজা বই শুকাতে দিতাম, পড়া থেকে বাঁচার জন্য। আশে পাশে যখন হাঁটু সমান পানি হত তখন বন্ধুরা মিলে জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম মাছ ধরার নেশায়। সন্ধার আগে বড় বড় মাছ নিয়ে সবাই বাসায় ফিরে আসতাম।
সিফাতঃ হুম… শুনেছি। আম্মু আমাকে বলেছে তুমি একবার অনেক বড় একটি বোয়াল ধরেছিলে। মামা…. তুমি কি আম চুরি করেছ কখনো?
আমিঃ মজার একটি কথা মনে করিয়ে দিলি। গ্রামে ফল গাছের অভাব ছিল না। আমরা খবর রাখতাম কোন গাছের আম-জাম বেশী মিষ্টি, কাদের গাছে বড় বড় কাঠাল আছে, কাদের গাছের আমড়া বেশি। একদিন সু্যোগ বুঝে দিন-দুপুরে সবাই মিলে চুরে করে ইচ্ছেমত খেতাম আবার মাঝেমধ্যে দৌড়ানী খেতামও বটে।
সিফাতঃ চুরি করে খাও আর যেভাবেই খাও তুমরা খেয়েছ টাটকা ফল আর আমরা এখন খাচ্ছি ফরমালিনযুক্ত।
আমিঃ তা ঠিক। এখন সবকিছুতেই ভেজাল। মাছ, মাংস, সবজ্বি, ফলমূলাদি কিছুই আর বাদ নেই এই বিষ থেকে।
সিফাতঃ মামা তুমার এসব শুনে ইচ্ছে করছে এখুনি গ্রামে ছুটে যায়। গ্রাম কি এখন আগের মতই আছে মামা?
আমিঃ নারে ভাগ্নে। আধুনিকতার ছুঁয়ায় গ্রাম অনেক বদলে গিয়েছে। শহরের সাথে গ্রামের এখন অনেক কিছুই মিলে যায়।
_ সিফাতের সাথে কথা বলতে বলতে আমার অনেক সৃতি বিজড়িত ঘটনা মনে পড়ে যায়। আমি সবই শেয়ার করছিলাম আর সিফাত অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছিল। যা আমার কাছে বাস্তবের মত ছিল তার কাছে ছিল কল্পনার মত।
প্রকৃতির নিয়মে হয়তো ‘গ্রাম’ নামটি অর্ধ-শহরে পরিণত হয়েছে কিন্তু আমি এখনো অনেক মিস করি আমার ছোটকালের অনুন্নত মাতৃভূমি।





0 Comments